নিজস্ব প্রতিনিধি : এতদিনে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে কলকাতা শহরের উত্তর প্রান্তে শ্রীভমি স্পোর্টিং ক্লাবের দুর্গা পুজোয় উচ্চতা বিধি থেকে কোভিড বিধি কিছুই মানা হয়নি। কাঠগড়ায় উঠেছেন এই পুজোর উদ্যোক্তা রাজ্যের দমকল মন্ত্রী। তিনি আবার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন শহরের অন্যান্য পুজোতেও নাকি উচ্চতা বিধি মানা হয়নি। এই কথা বলে তিনি কাদের চিহ্নিত করতে চেয়েছেন তা বোঝা গেলেও যেহেতু পুজোয় দমকলের অনুমতি নিতে হয় তাই দমকল মন্ত্রী হিসাবে তাঁর মতামত অগ্রাহ্য করার মতো নয়। সব মিলিয়ে যা দাঁড়ালো তা হল রাজ্যের অনেক পুজোতেই সরকারি বিধি নিষেধের তোয়াক্কা করেন নি নেতারা।
আসলে ডান-বাম বলে নয়, সব আমলেই নেতারা আইন লঙ্ঘন করতে পছন্দ করেন। সরকারি নীতি নিয়ম তাদের উদ্ধত মনোভাবের কাছে চিরকালই পদদলিত হয়ে এসেছে। সত্তর দশকে রাস্তা বন্ধ করে জলসার আসরে এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কথা তুলে ধরার জন্য আলিপুরের তত্কালীন বিধায়কের চেম্বারে ঢুকিয়ে তাঁর চেলারা তাঁরই সামনে আলিপুর বার্তার বার্তা সম্পাদককে বেধড়ক মার মেরে রক্তপাত পর্যন্ত ঘটিয়েছিল। এই ঘটনা নিয়ে তত্কালীন বাম সাংসদ সংসদে সাংবাদিকের অধিকার ভুলুন্ঠিত বলে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধীকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত পর্যন্ত করেছিলেন। আজও নেতা-নেত্রীরা সেই ট্রাডিশন সমানে বজায় রেখে চলেছেন। আজও শহরের বহু জায়গায় রাস্তা দখল বা শব্দের উত্পাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় মার খেতে হয় প্রতিবাদীদের।
আসল প্রশ্নটা হল নেতা-নেত্রীদের এইসব আইন ভাঙার বিরুদ্ধে প্রশাসনের ভমিকাটা কী? প্রশাসন কি কঠোর হাতে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তৈরি। উত্তর হল, না। এরপর যে প্রশ্নটা জাগে সেটা হল প্রশাসনের এই আত্মসমর্পণ কেন? রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে প্রশাসন যদি বিকিয়ে যায় তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? সত্তর দশকে কিন্তু আলিপুর থানা সেদিনের ঘটনায় বিধায়কের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের করা এফআইআর গ্রহণ করেছিল। এমনকি আক্রান্ত বার্তা সম্পাদককে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রকৃত মেডিক্যাল রিপোর্ট পর্যন্ত করিয়েছিল। আজকের প্রশাসন সেই সামান্য কর্তব্যবোধটুকুও হারিয়ে বসে আছে। ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা সামান্য এফআইআরটুকু নিতেও তারা কুন্ঠা বোধ করে। এই সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকেই দ্বিগুণ উত্সাহে কাজে লাগাতে নেমে পড়েছেন আজকের নেতা নেত্রীরা। এলাকায় এলাকায় এখন আর প্রশাসনের কর্তত্ব চলে না, চলে রাজনৈতিক দাদা-দিদিদের শাসন। প্রজাতন্ত্র এ রাজ্যে রূপ নিয়েছে রাজতন্ত্রের। ফিরে এসেছে সেই জমিদার-জোতদারদের সামন্ততান্ত্রিক বাতাবরণ। যেখানে অনৈতিক কাজের প্রতিবাদটুকু করতেও বুক কাঁপে, এই বুঝি দাদা দিদির চেলারা এসে হুমকি দিয়ে যায়।
করোনাকালের দ্বিতীয় শারদ উত্সব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে প্রশাসনের দুর্বলতা। আদালত যখন মণ্ডপে মণ্ডপে দর্শক ঢোকা নিষিদ্ধ করে প্রশাসন তখন রাস্তায় বাঁশের ব্যারিকেড খাটিয়ে, নৈশ কারফিউ শিথিল করে দর্শক সমাগমে উত্সাহ দেয়। প্যাণ্ডেলের উচ্চতা যখন ৪০ ফুট নির্দিষ্ট হয় তখন সেসব কাগজে কলমে রেখে চুপ করে থাকে নিয়ম লঙ্ঘিত বড় প্যান্ডেল দেখেও। এমনকি স্বতঃপ্রণোদিত এফআইআর পর্যন্ত দায়ের করার মতো সাহস দেখাতে পারে না প্রশাসন। দুর্গাপুজো কেটে গিয়েছে এক সপ্তাহ হয়ে গেল এখনও পর্যন্ত নিয়ম লঙ্ঘনকারীর শাস্তির ব্যাপারে উদ্যোগী হতে দেখা গেল না প্রশাসনকে। আইএসএস-আইপিএস তকমাধারী বড় কর্তারা সব শামুকের খোলসে ঢুকে বসে রয়েছেন সমালোচনার ঝড় থামার অপেক্ষায়।
দুর্ভাগ্য গণতন্ত্রের, এমন শিরদাঁড়াহীন প্রশাসনকে নিয়েই দিনযাপন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। তাদের করের অর্থতেই পোষা হচ্ছে রাজনৈতিক সরকারি মদতদাতাদের। কবে এই গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের অবসান হবে তার উত্তর জানা নেই। তবে এটা নিঃসন্দেহ যে সাধারণ মানুষের অধিকার ও চাহিদার পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই। এইজন্যেই তো আজও ভারতবর্ষে বহাল তবিয়তে রাজ করছে ব্রিটিশ আমলের পুলিশ আইন।